সুনামগঞ্জ ভ্রমনকথা
ঘুরে আসতে পারেন সীতাকুন্ড থেকে
ঘুরে আসতে পারেন সীতাকুন্ড থেকে
November 14, 2018
বিছনাকান্দি-পান্তুমাই-রাতারগুল ভ্রমণ (১ দিনে)
November 14, 2018

হাওড়-বাওড়ের দেশ সুনামগঞ্জ।যেদিকেই চোখ যায় পানি থৈথৈ করে।পূর্ণিমা রাতে নৌকার ছাদ থেকে পানিতে চাঁদের যে অবয়ব অবলোকন করা যায় তা এককথায় অসাধারণ।আর সেই চাঁদনী রাতের সাথে যদি যোগ হয় মাঝির গলায় ভাটিয়ারী টান,কি ফিল পাওয়া যায় সেটা এখানে বর্ণনা করা যাবে না।পানির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে এই জায়গায় আসা বাধ্যতামূলক।

সিলেট থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের চেরাপুঞ্জির কোল ঘেঁষে এর অবস্থান।গত বছরের এই মৌসুমেই কোন এক পূর্ণিমায় ৪৪ জনের বিশাল বহর নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে গিয়েছিলাম সুনামগঞ্জ ঘুরতে।২ দিনে পুরো সুনামগঞ্জ কাভার করে আসলাম।আমাদের জনপ্রতি খরচ হয়েছিলো ২৬০০ টাকা করে।চলুন আমাদের ভ্রমণকাহিনীটা শোনা যাক।

ভ্রমণ বৃত্তান্তঃ 
ঢাকা থেকে সরাসরি বাস থাকলেও চট্টগ্রাম থেকে সুনামগঞ্জের কোন সরাসরি বাস নেই।চট্টগ্রাম থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই আগে সিলেট আসতে হবে।সিলেট কিভাবে যাবেন সেটা আগেও এক পোস্টে বিস্তারিত বলা হয়েছে।তাই এখানে আর সেসব টানছি না।চাইলে এই লিঙ্ক থেকে আগের পোস্টটি দেখে নিতে পারেনঃ
https://www.facebook.com/sadman.rdx/media_set…

সিলেট রেইল স্টেশনের সামনেই বাস স্ট্যান্ড।এখান থেকে সুনামগঞ্জের বাস ছাড়ে।আপনি ভোরে সিলেট পৌঁছালে তখনি রোউনা হয়ে যেতে পারেন সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে।ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা।২ ঘণ্টার মধ্যেই সুনামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে যাবেন।সেখান থেকে আবার টেম্পু/লেগুনা রিজার্ভ করে যেতে হবে তাহিরপুর ঘাট।১২০০ টাকা করে নিবে।১৫ জন বসা যায়।তাহিরপুর পৌঁছানোর পর আপনাদের নৌকা ঠিক করতে হবে।ওখানকার সবচেয়ে বড় নৌকাটার ভাড়া ৮ হাজার টাকা।ভিতরে ঘুমানোর ব্যাবস্থা আছে।সাথে টয়লেটও আছে।পোস্টের শেষে আমি ওই নৌকার মাঝির নম্বর দিয়ে দিবো।নৌকা ঠিক করে আগে আপনাকে তাহিরপুর থানায় গিয়ে এন্ট্রি করিয়ে নিতে হবে।তারপর তাহিরপুর বাজার থেকেই দুই দিনের জন্য বাজার করে নিতে হবে।এসব কাজ সারার পরেই মূলত শুরু হবে আপনার ট্যুর।

টাঙ্গুয়া হাওড়ঃ 
মাঝি আর বাবুর্চি নিয়ে তাহিরপুর ঘাট থেকে হাওড়ের দিকে যাত্রা শুরু করবেন।ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হাওড়ের গভীরে চলে যাবেন আপনি।এখানে একটা সোয়াম্প ফরেস্ট আছে।এটি রাতারগুলের চেয়েও বেশ বড় আর ঘন।এর ভিতরে ঢুকার জন্য ছোট ডিঙ্গি নৌকা লাগে।মাঝিকে বললে উনি ব্যাবস্থা করে দিবেন।এই সোয়াম্প ফরেস্ট পার হয়ে নিয়ে যাবে ওয়াচ টাওয়ারে।এর চুড়া থেকে পুরো হাওড়ের অসম্ভব সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে লাফ দেয়ার ব্যাপারে সাবধান থাকুন।এখান থেকে লাফ দেয়ার ফলে মৃত্যুও হয়েছে।

এগুলো ঘুরতেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে।সন্ধ্যায় হাওড়ের বুকে আকাশ থেকে নেমে আসা সূর্যের লাল কিরন এক অভাবনীয় সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।এই দৃশ্যে একবার চোখ পড়লে আর সরাতে পারবেন না।সন্ধার পর নৌকা ভিড়াবে টেকেরঘাট।এখানের স্থানীয় বাজার থেকে চাইলে চা-নাস্তা খেয়ে আসতে পারেন।রাত এখানেই কাটাতে হবে।চাঁদের আলোয় নৌকার ছাদে গান আর আড্ডায় ভালোই কাটে রাতটা।

লাকমাছড়াঃ
পরদিন সকালে উঠে আগে লাকমাছরা ঘুরে আসুন।টেকেরঘাট থেকে মূল রাস্তায় উঠে বাম দিকে ১৫-২০ মিনিট হাটলেই আপনি পেয়ে যাবেন এই স্থান।এটা মুলত জাফলঙের মতোই একটা ছড়া।

নিলাদ্রি লেকঃ
এর অফিসিয়াল নাম শহীদ সিরাজ লেক হলেও এই নামেই এটি বহুল পরিচিত।পাশে চুনাপাথরের খনি থাকায় একে লাইমস্টোল লেকও বলা হয়।এই লেকের স্বচ্ছ পানিতে গোসল করার ইচ্ছা আপনার জাগবেই।লেকের সামনেই রয়েছে থরে থরে সাজানো টিলা।এই টিলার চুড়া থেকে মেঘালয়ের পাহাড়গুলো অনিন্দসুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

বাঝাছড়া ঝর্নাঃ 
নিলাদ্রি লেক থেকে মোটরসাইকেল ঠিক করে নিন শিমুল বাগান যাওয়ার জন্য।জনপ্রতি ১০০ টাকা করে পড়বে।বাইকারকে বললে যাওয়ার পথে তিনি আপনাকে এই ঝরনা দেখাবে।যদিও ছোট্ট একটা ঝরনা,হালকা ভিজে আসলে শান্তি পাবেন।

শিমুল বাগানঃ
প্রায় ১০০ বিঘা জায়গার উপর ২ হাজার শিমুল গাছ নিয়ে এই বাগান।অন্য সময় সবুজে ভরে থাকলেও বসন্তে দেখা যায় এই বাগানের ভিন্ন রুপ।এসময় পুরো বাগান ছেয়ে যায় লাল রঙে।প্রত্যেক ডাল শিমুল ফুলে লাল বর্ণ ধারণ করে।

বারিক্কা টিলাঃ
শিমুল বাগান থেকে ১৫-২০ মিনিট হেটে যেতে হবে বারিক্কা টিলা।এখানে জিরো পয়েন্টের একটা স্তম্ভ আছে।অরথাত,এই স্তম্ভের ওই পাশে ভারত।এখান থেকে যাদুকাটা নদীর অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়।নদীর ওপারে মেঘালয়ের পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঝর্নাগুলো এপাশে দাঁড়িয়ে দেখতে কেবল আফসোসই হয়।

যাদুকাটা নদিঃ
পুরো ট্যুরের সেরা স্থান বোধ হয় এটাই।আসলেই যাদু আছে এই নদীতে।বারিক্কা টিলার নিচেই যাদুকাটা নদী।দেখতে ঠিক লাদাখের পেংগং লেকের মত।পানির বর্ণ ঘন নীল।এই পানিতে আরেকবার জলকেলি না করলে ক্ষুধা মিটবে না।

টেকেরঘাট থেকে নৌপথে নৌকা যাদুকাটা নদী চলে আসবে আপনাদের নিতে।গোসল শেষ করে নৌকায় উঠে রউনা দিয়ে দিতে পারবেন।নৌকা আবার হাওড় হয়ে আপনাদের তাহিরপুর ঘাটে নামিয়ে দিবে।যেভাবে আসছেন সেভাবেই আবার চলে যেতে হবে আবার।

মাঝিঃ
আজমন মামা- ০১৭২১৯৬৩২৬৩।
পুরো ট্যুরে উনি আমাদের গাইডের কাজ করেছেন।মোটরসাইকেল/লেগুনা এগুলো আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন।বাজারো করে রেখেছিলেন আগে থেকেই।প্রতিটা স্পটে উনি নিজে থেকে আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন।উনার গানের গলাও বেশ ভালো।ব্যাবহারও ভীষণ অমায়িক।আপনাদের খাবার রান্না ও খাওয়ার জন্য ডেকচি,মগ,গ্লাসও ভাড়া নিতে হবে যা তিনি ব্যাবস্থা করে দিবেন।

আর টাঙ্গুয়াতে এখন তাবুতে থাকার ব্যাস্থা হয়েছে 01748972158 (সোহাগ)। আর রিসোর্ট ও আছে একটা, নাম- হাওড় বিলাস, খসরু ভাই 01735464481 । চাইলে নৌকায় না থেকে এগুলোতেও থাকতে পারেন।

আরও ছবি দেখার জন্য এই এলবামটি ঘুরে আসতে পারেনঃ
https://free.facebook.com/sadman.rdx/albums/1972901649440909/?refid=17&ref=bookmarks&_ft_=top_level_post_id.1972902032774204%3Atl_objid.1972902032774204%3Aphoto_attachments_list.%5B1972902032774204%2C1972901736107567%2C1972902742774133%2C1972902096107531%2C1972901726107568%5D%3Aphoto_id.1972902032774204%3Athid.100001632781642%3A306061129499414%3A43%3A0%3A1538377199%3A-437196462884182632&__tn__=-R

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ
১।সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট অবশ্যই রাখতে হবে।আর সাঁতার জানলেও লাইফ জ্যাকেট রাখলে সুবিধা পাওয়া যাবে।
২।পরিচয়পত্র সাথে রাখুন।
৩।ট্রেনে গেলে চেষ্টা করুন ১০ দিন আগেই আপ-ডাউন দুটো টিকেটই একসাথে করে ফেলার।
৪।১৫-১৬ জনের দল হলে খুব কম খরচে ঘুরে আসতে পারবেন।
৫।পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখুন।কারণ বুঝতেই পারছেন।
৬।লোকাল লোকজন অতিথিপরায়ন কিন্তু তাদের সাথে তর্কাতর্কি তে না যাওয়াই ভাল।
৭।টুরে অযথা বীরত্ব না দেখানোই উচিত, হয়তো কিছুই হবে না কিন্তু যে দেশের সীমান্তরক্ষীরা ফেলানীকে মেরে কাটা তারে ঝুলিয়ে রাখে তারা “কিছু করবে না” এই বিশ্বাস আমি করতে রাজি না।
৮।কোন ছাইয়া পাবলিকদের দলে ভিরাবেন না, মনে রাখবেন, একজন স্বার্থপর টুর মেম্বার আপনার স্বাধের টুরের ১২টা বাজায় ফেলতে পারে।

বিঃদ্রঃ হাইড় ও নদীর পানিতে কোন প্রকার ময়লা-আবরজনা ফেলবেন না।প্লাস্টিক/পলিথিন প্রভৃতি নৌকার এক কোনায় জমিয়ে রাখুন।মাঝি পরবর্তীতে এগুলা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দিবে।ঘুরতে গিয়ে পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

লেখকঃ 

Saadman Ishraque