কমখরচে মেঘালয় ভ্রমন
শ্রীমঙ্গল ভ্রমন
শ্রীমঙ্গল ভ্রমন
November 14, 2018
ভূটান ভ্রমণ
November 15, 2018

মেঘালয় – বিছানাকান্দি, জাফলং এর খরচে আর সময়ে দারুনভাবে ঘুরে আসুন!

প্রথমবার যখন বিছানাকান্দি যাই তখন সালটা ২০১৫। ট্রাভেলিং সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই কম। বিছানাকান্দি গিয়ে এত পরিমান হতাশ হয়েছিলাম দূরে পাহাড়, ব্রীজটা আর ঝর্ণাটা দেখে তা বলার বাহিরে। যতক্ষণ সেখানে ছিলাম বারবার মনে হচ্ছিল এই পাহাড়গুলো বাংলাদেশে থাকলে কত জোস হতো ব্যাপারটা। ঘন্টা খানেক এই চিন্তা করে একসময় চলে গেলাম পান্তুমাই (বাংলাদেশের নাম) ঝর্ণা দেখতে পান্তুমাই গ্রামে। কোথায় এক জায়গায় পড়েছিলাম পান্তুমাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম গুলোর একটা। গিয়ে আবার সেই হতাশা। বারবার চিন্তা করছিলাম ঠকানো হয়েছে বাংলাদেশকে মেঘালয় ভারতের অংশে দিয়ে। এভাবে পুরো ট্রিপটাই তখন আমার হতাশা আর হতাশায় কেটেছে শুধুমাত্র পানসী আর ভোজনবাড়ীতে খাওয়া দাওয়ার পার্ট টুকু ছাড়া। তখন রাতে খাবারের সময় চিন্তা করে নিয়েছিলাম একদিন বিছানাকান্দির ওপারে যাবোই আমি। কিন্তু তখন আমার মোটেও ধারনা ছিল না বিছানাকান্দির ওপারে এত সহজেই যাওয়া যায়।

আগে একবার মেঘালয় ঘুরে আসলেও আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সোনেংপেডাং গ্রামটিকেই। অবস্থানগত দিক দিয়ে এটি বাংলাদেশের সীমান্তের খুব কাছেই। আর খুব সহজেই যাওয়া যায়। তাই এবার আমরা চিন্তা করেছিলাম সোনেংপেডাং যাবো দুইদিনের জন্য। অফিসের ছুটি আর বাড়তি কোন ঝামেলা নেই। হিসেব করে আমরা অফিস করে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে এনা পরিবহনে সিলেট রওনা হলাম। রাস্তায় গাড়ীর চাকা নষ্ট হওয়া আমাদের হিসাবের একঘন্টা পরে সিলেট পৌছে। কাউন্টারে ফ্রেশ হয়ে পরদিনের ঢাকার রিটার্ন টিকেট কেটে নিয়ে পাশেই এক হোটেলে নাস্তা করে নিলাম। তারপর বাসস্ট্যান্ডের সামনের রাস্তা থেকেই জাফলং এর বাসে উঠে গেলাম তামাবিল বর্ডারে যাওয়ার জন্য।

সোনেংপেডাংকে বেছে নেয়ার কারণ হচ্ছে এখানে মোটামুটি বিছানাকান্দি-রাতারগুলের খরচেই ঘুরে আসা যায়। একদম কাচের মতো স্বচ্ছ পানি, দুইটি সাস্পেনশন ব্রীজ আর নানা ধরনের এডভেঞ্চার একটিভিটি মিলিয়ে জায়গাটা অসাধারণ। এখানে চাইলে বোটে করে ঘুরে আসা যায় পুরো গ্রাম। কায়াকিং করার যায় নিচের ইচ্ছামতো। রয়েছে জিপ লাইনিং, ক্লিফ জাম্পিং এর ব্যবস্থা আর খুব এডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য স্কুবা ডাইভিং এর ব্যবস্থাও। আর স্বচ্ছ পানিতে আনলিমিটেড ঝাপাঝাপি আর স্নোরকেলিং এর জন্যও এটি আদর্শ জায়গা। রাতের থাকার জন্য বেশ কয়েকটি কটেজ আর ক্যাম্প গ্রাউন্ড রয়েছে সেখানে। খরচও মোটামুটি কম।

আমরা টিমে ছিলাম মোট ০৮ জন। বাসে করে দেড় ঘন্টা পরে আমরা তামাবিল বর্ডারে নেমে দুইপাড়ের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস শেষ করতে আমাদের তেমন সমস্যা হয়নি। ডাউকি বাজার এখনও এনালগ সিস্টেমে চলে। এর কারণে কখনো সময় একটু বেশি লাগলেও ঝামেলা একদমই হয় না। তবে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনে আপনাকে ১০০ টাকা ঘুষ দিতে হতে পারে। তারা ছবি তোলার পরই ১০০ টাকা চায়। আর পুরো প্রসেসের মধ্যে এই পার্ট টুকুই একমাত্র ডিজিটাল। তাই আমার মনে হয় ডিজিটালের চাইতে এনালগই ভালো ছিল। একটা ডাউশ সাইজের খাতায় নাম পাসপোর্ট নাম্বার এন্ট্রি করে সিল দিয়ে কাজ শেষ।

বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ফর্মালিটি শেষ করে প্রথমেই পড়ে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ গেট। গেটের পাশেরই বিএসএফ চেক পোস্ট। পাসপোর্টে সিল চেক করে তারা পাঠিয়ে দিলো ইমিগ্রেশনে। গেট থেকে প্রায় এক মিনিট হেটে যেতে হয় ইমিগ্রেশন অফিসে। ইমিগ্রেশন আর কাস্টম একই জায়গায় হয়। প্রথমেই আমরা দুই জায়গা থেকে দুটি ফরম নিয়ে পূরণ করে জমা দিয়ে দিলাম ইমিগ্রেশনে। তারা হাতে কলমে এন্টি করে খাতায় সাইন নিয়ে সিল দিয়ে দিল। তারপর কাস্টমসের মহিলা অফিসার ডলার আর টাকা নিয়ে কিছুক্ষণ জ্ঞান দান করে খাতায় এন্ট্রি করে সাইন নিয়ে ছেড়ে দিলো। 
মজাটা আসলে এখানেই। যেখানে এখন বিছানাকান্দি রাতারগুল, জাফলং ট্রিপ করতে দুইদিনে ৫০০০-৬০০০ টাকা লাগে সেখানে আমরা এই বাজেটে মেঘালয়ের অনেকখানিই ঘুরে ফেলতে পারি। আমাদের প্ল্যাণ ছিল উমক্রেম ফলস, বরহিল ফলস (বাংলাদেশে যেটাকে আমরা পান্তুমাই বলি), মাওলিনং ভিলেজ আর রুট ব্রীজ ঘুরে রাতে সোনেংপেডাং চলে যাওয়া। আর পরদিন সকালে সব ধরনের এক্টিভিটি করে ক্রাংসুড়ি চলে গিয়ে বিকেলে বর্ডার ক্রস করে ঢাকার দিকে রওনা করা।

আগেরবার মেঘালয়ে গিয়ে বেশ কিছু ড্রাইভারের সাথে পরিচয় হলেও সবার বাসাই শিলং। আমরা যেহেতু দুইদিন ঘুরবো তাতে করে কেউ ডাউকিং এসে আমাদের নিয়ে যেতে চাইলো না খরচের কথা চিন্তা করে। ইমিগ্রেশন অফিসের পাশেই বেশ কিছু ছোট গাড়ী, জীপ দাড়িয়ে থাকে। তাদের একজনের সাথে কথা বলে দামাদামিতে না মিলায় আমরা হেটেই রওনা হলাম ডাউকি বাজারের দিকে। পায়ে হেটে ডাউকি বাজারে যেতে সময় লাগবে ৮-১০ মিনিটের মতো। এখানে গাড়ীর স্ট্যান্ড আছে। ডাউকি বাজারে কোন অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ না থাকায় এখানে বেশ কিছু দোকানে মানি এক্সচেঞ্জ করা। রেট যদিও ১ টাকা করে কম দেয়। আমরা প্রথমেই একটি দোকানে গিয়ে আমাদের সাথে থাকা সব টাকা ভাঙ্গিয়ে নিলাম। তারপর বরহিল ফলস, উমক্রেম ফলস, মাওলিনং ভিলেজ, লিভিং রুট ব্রীজ ঘুরে রাতে সোনেংপেডাং আর পরদিন ক্রাংসুড়ি ফলস ঘুরিয়ে বিকেলে ডাউকি ইমিগ্রেশনে ড্রপ করার জন্য সুন্দর একটা জীপ রিজার্ভ করে নিলাম ৫০০০ রুপিতে। তারপর কোক, মাজা, চিপস নিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের মেঘালয় ভ্রমন। প্রথমেই হালকা একটু জ্যাম ঠেলে ডাউকি ব্রীজের উপর দিয়ে বাংলাদেশ দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। ডাউকি ব্রীজটা আসলেই সুন্দর। ছোটবেলা জাফলং ঘুরতে গিয়ে প্রচুর ভালো লেগেছিল। নীল পানিতে মনে হয় বোটগুলো শূন্যে ভাসছে। একটু দূরেই হাজার হাজার মানুষ গিজগিজ করছিল। বুঝতে বাকি থাকে না সেটাই বাংলাদেশের শেষ সীমানা।

মিনিট বিশেকের মধ্যেই আমরা পৌছে গেলাম উমক্রেম ফলসে। শীতকালের শুরু হওয়ায় এখন পানি নেই বললেই চলে। এক কোনা দিয়ে সামান্য পানি পড়ছে। কিন্তু যেখানে পড়ছে সেখানে অসাধারণ একটা ন্যাচারাল সুইমিং পুল আর শান্ত নীল পানি। আমরা ড্রেস চেঞ্জ করে নেমে পড়লাম। গোপ্রো দিয়ে কিছু ছবি তুললাম পানির নিচে। এখন ঝর্ণা দেখার সময় না হওয়ায় আমাদের বেশ কিছুক্ষণ পরে মাত্র একটা ফ্যামেলী এসেছিল এখানে। অথচ গতবার যখন এসেছিলাম এখানে মানুষের মাথার কারণে ছবি তোলাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। নিজের ছবিতে আশেপাশের মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছিল। প্রায় আধঘন্টা ঝর্ণার সময় কাটিয়ে আমরা রওনা হয়ে গেলাম আমাদের পরের গন্তব্য বরহিল ফলসে।

প্রথমবার পান্তুমাই ঝর্ণা দেখার জন্য যখন পান্তুমাই এসেছিলাম তখন মনে হচ্ছিল ছোট একটা খাল। হেটে পার হয়ে গেলেই চলে যাওয়া যায়। কিন্তু এক পা এগুলেই বিএসএফের হুইসেলের শব্দ পাওয়া যায় এখানে। আশে পাশে তাকিয়ে কিছু না দেখা গেলেও এখন জানি । ব্রীজের ডানদিকে সুপারি গাছের সাইডে একটা বিএসএফের চৌকি রয়েছে। ওই পার থেকে ঘন সুপারির বাগান মনে হলেও এখান থেকে ওই পার দেখা যায় খুব পরিষ্কার। কেউ সীমানা পাড় করতে চাইলে তারা তাৎক্ষনিক বাশি বাজিয়ে সতর্ক করতে থাকে।

উমক্রেম থেকে বরহিলের যেতে আমাদের টাইম লেগেছিল মোটামুটি আরো ২০-৩০ মিনিট। উমক্রেমের মতোই বরহিলের অবস্থা ছিল। একদম কম পানি। কিন্তু পানি কম থাকলেও এই ঝর্ণাটা খুব সুন্দর আর আকৃতিতে বিশাল। আমরা সিলেট থেকে এর নিচের অংশ দেখলেও এর উপরের অংশটাই বেশি সুন্দর। বেশি কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা রওনা হয়ে গেলাম মাওলিনং এর উদ্দেশ্যে। ততোক্ষণে ক্ষিদায় আমাদের অবস্থা খারাপ কিন্তু রাস্তায় কোন খাবারের দোকান ছিল না। প্রায় ঘন্টা খানেক পাহাড়ী আকাবাকা রাস্তা, গ্রামের ভিতর দিয়ে আমরা পৌছালাম মাওলিনং এর ০২ কিলোমিটার আগে নহতওয়ে রুট ব্রীজে। এখানে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট রয়েছে। দাম রিজনেবল আর খাবারের মান খুবই ভালো। আমরা সবাই চিকেন থালি দিয়ে লাঞ্চ শেষ করে চলে গেলাম রুট ব্রীজ দেখতে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ঝিরির উপর দিয়ে দুই পাশের দুইটি গাছের শিকড় যুক্ত হয়ে গড়ে উঠেছে এই ব্রীজ। ব্রীজে ঢুকতে আপানাদের ২০ রুপির টিকেট নিতে হবে প্রতিজন। রুট ব্রীজের ওপারে পাহাড়ের উপর একটি ভিউ পয়েন্ট রয়েছে। সাধারণত সবাই রুট ব্রীজ দেখে ফেরত আসলেও অর্ধেক সৌন্দর্য্য উপরের ওই পয়েন্টে। সিড়ি দিয়ে পাহাড়ে উঠে তিনটা গ্রামের উপর দিয়ে প্রায় ২৫-৩০ মিনিট হেটে নহতওয়ে ভিউ পয়েন্ট। পাহাড়ের ঢালে সম্পূর্ণ বাশের সাহায্যে উচু মাচা বানিয়ে ভিউ পয়েন্টটি বানানো হয়েছে। যেখানে গিয়ে দূরের পাহাড়ের ল্যান্ডস্ক্যাপ, সানসেট খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। ভিউ দেখে আমারা আবার রওনা হলাম গাড়ীর দিকে তারপর মাওলিনং।

মাওলিনং ভিলেজে যখন পৌছালাম তখন সন্ধ্যা হবে হবে ভাব। ৫০ রুপি পার্কিং ফি দিয়ে ঢুকে গেলাম। খুব সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি একটা গ্রাম। এটিকে এশিয়ার অন্যতম সুন্দর পরিচ্ছন্ন গ্রাম বলা হয়। প্রত্যেকটা বাড়ীর সামনেই বাহারী গাছ আর ফুলের বাগান রয়েছে। রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকান সাজানো বিভিন্ন রকমের পন্য দিয়ে। এর মধ্যে মেয়েদের কানের দুল আর চাবির রিং এর বেশ ভালো রকমের কালেকশন আছে সব জায়গায়। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে চা খেয়ে আবার রওনা হয়ে গেলাম আমাদের আজকের শেষ গন্তব্য সোনেংপেডাং এ। যার জন্য বেশ খানিকক্ষণ ধরেই আগ্রহ নিয়ে গাড়ীতে বসে আছি।

মাওলিনং থেকে প্রায় দেড় ঘন্টার মতো ড্রাইভ করে আবার পুরো রাস্তা ঘুরে চলে এলাম ডাউকি তারপর উপরের দিকে উঠে সোনেংপেডাং। আমাদের কটেজ ঠিক করাই ছিল। ব্রাইট স্টার কটেজ গুলো থেকে মোটামুটি ভালো ভিউ পাওয়া যায়। দাম যদিও অন্যগুলার থেকে একটু বেশি নেয়। আমরা দুই রুম নিয়ে ছিলাম ২৭০০ রুপিতে। আগে থেকে ফোনে ঠিক করার জন্য দামাদামির তেমন সুযোগ আমরা পাই নি। গিয়ে অবশ্য দেখেছিলাম বেশ কয়েকটা কটেজ খালিই আছে। সোনেংপেডাং এ থাকার তেমন সমস্যা নেই। বেশ কয়েকটা ক্যাম্প গ্রাউন্ড রয়েছে। দুইজনের তাবুর জন্য ভাড়া পড়বে ৭০০ রুপি আর ৩ জনের জন্য ১০০০ রুপি। ক্যাম্পের মধ্যের প্রয়োজনীয় সবকিছু থাকবে যেমন স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ, লাইট। শুধুমাত্র টয়লেট ব্যবহারের জন্য পাবলিক টয়লেট ইউজ করতে হবে ১০ রুপি করে। খাবারের ব্যবস্থা ওদের বললেই করে দিবে বা কেউ চাইলে নিজেদের ইচ্ছামতো খেতে পারবে যেকোন জায়গায়। দুয়েকটা রেস্টুরেন্ট রয়েছে সোনেংপেডাং এ। যদিও এখানে খাবারের দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। আমরা চিকেন থালি নিয়েছিলাম রাতে ২০০ রুপিতে।

সোনেংপেডাং আমাদের নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার চলে গিয়েছিল। তারসাথে কথা ছিল সকাল ১১ টার দিকে আবার এসে আমাদের নিয়ে যাবে। ততোক্ষণে আমরা সোনেংপেডাং ঘুরে ফিরে রেডি হয়ে থাকবো। ক্রাংসুড়ি যেতে এখান থেকে প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগে। তারপর ক্রাংসুড়িতে ঘন্টা খানেক কাটিয়ে সোনেংপেডাং। আমরা রাতে খেয়ে দেখে ঘুরে ফিরে ঘুমাতে যাই প্রায় রাত ৩ টার দিকে। সকালে যদিও আগেভাগেই উঠে গিয়েছিলাম সবাই। কিন্তু সকালে উঠে দেখি বোটিং, কায়াকিং এগুলো সবকিছুই সকাল ১০ টার আগে ওপেন হবে না। কি আর করা! আমরা নাস্তা শেষ করে দুইটা ব্রীজ ঘুরে ছবি তুলতে তুলতে ১০ টা বেজে গেলো। আমাদের প্ল্যাণ ছিল কায়াকিং আর বোটিং করার। কিন্তু হাতে যেহেতু সময় ছিল না তাই আমরা শুধুমাত্র কায়াকিং নেই। ঘন্টা ৫০০ রুপি। দূরে এক জায়গায় জিপ লাইনিং এর ব্যবস্থা আছে। জনপ্রতি ৩০০ রুপি। ক্লিফ জাম্পিং এরও ব্যবস্থা আছে কিন্তু এটার জন্য ৩০০ রুপি দিতে হবে। এই ব্যাপারটা আমার মাথায় আসে নাই। ন্যাচারাল একটা বিশাল পাথরের উপর থেকে লাফ দিতে তাদেরকে ৩০০ রুপি দেয়ার মানেটা আসে কি হতে পারে সেটা আসলে রহস্য। জিপ লাইনিং এর অপর প্রান্তে স্কুবা ডাইভিং এর ব্যবস্থা আছে জনপ্রতি ২৫০০ রুপিতে। সাথে একজন ট্রেইনার থাকবে। কিছুক্ষণ ট্রেনিং তারপর একাএকাই করা যাবে প্রাকটিস। কিন্তু এটা প্রায় ঘন্টা খানেকর ব্যাপার তাই আমরা করতে পারি নি।

কায়াকিং, জিপ লাইনিং শেষ করে আমরা পানিতে নেমে যাই গোসল করার জন্য। সাতার না জানলে অতিরিক্ত সাবধানতার সাথে এখানে নামা উচিত। পানি অতিরিক্ত স্বচ্ছ হওয়ার কারণে নিচের পাথর দেখে মনে হয় পানি অল্প কিন্তু দেখা যাবে পানি আপনাকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আমরা প্রায় ঘন্টা খানেক পানিতে সাতার কেটে ডুবে ডুবে ছবি তুলে ভিডিও করে হোটেলে ফিরে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে ক্রাংসুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করতে আমাদের ১ টা বেজে যায়। এদিকে বর্ডার বন্ধ হবে সন্ধ্যা ৬ টায়। হাতে তেমন সময় নেই। তারাহুরা করে ক্রাংসুড়ি যখন পৌছালাম তখন বেজে গেলো প্রায় আড়াইটা। গাড়ী থেকে নেমে প্রায় ১৫ মিনিটের মতো হেটে যেতে হয় ক্রাংসুড়ি ঝর্ণায়। ৪০ রুপি টিকেটের প্রাইজ। অদ্ভুত সুন্দর একটা ঝর্ণা। অন্যান্য ঝর্ণায় পানি না থাকলেও এটায় পানি থাকে সব সময়। উপরে বাধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ক্রাংসুড়ি যেখানে পরে সেখানে চমৎকার একটা গভীর নীল পানির সুইমিং তৈরী হয়ে গেছে প্রাকৃতিকভাবে। গভীরতা বেশি হওয়ায় এখানে লাইফ জ্যাকেট ছাড়া নামা নিষেধ। কর্তৃপক্ষে কাছ থেকে ৫০ রুপির বিনিময়ে লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নিয়ে চাইলে ভেসে বেড়াতে পারেন এখানে। 
আমাদের টুকটাক চকলেট, বডিস্প্রে কেনার জন্য প্রথমে ০৪ টার দিকে ডাউকি বাজারে আর তারপর ৫ টায় দেশে ঢোকার জন্য বর্ডার ক্রস করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা সকালে লেট করে বেড়িয়ে টাইম মিলাতে না পারায় ক্রাংসুড়িতে সময় কম ব্যয় করে দ্রুত চলে আসি গাড়ীর সামনে। ক্ষুধা থাকলেও সময়ের জন্য সেখানে খাওয়া হয় নি। গাড়ী করে রওনা করতে করতে বেজে গেলে প্রায় সাড়ে তিনটা। ডাউকি বাজারের একটু আগেই দারুন একটা খাবার হোটেল আছে। আমরা সেখানে লাঞ্চ শেষ করে যখন বর্ডারে পৌছাই তখন বিকাল পৌণে পাচটা। এসে শুনি বর্ডার খোলা থাকবে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত। তো আর কি করা। আবার চলে গেলাম ডাউকি বাজারে আধঘন্টায় চকলেট আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে ছয়টায় আমরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়লাম। তারপর আগের মতোই। তামাবিল থেকে বাসে করে সিলেট। সেখান থেকে পানসিতে গরুর মাংস আর কোয়েল পাখির মাংস দিয়ে ইচ্ছামতো ভাত খেয়ে দুইদিনের জমানো বেশ কিছু স্মৃতি নিয়ে রাতের বাসে ঢাকা চলে আসলাম।

কিছু জিনিস খেয়াল রাখা দরকারঃ
=========================
* ৪/৮-৯ জন গেলে কার/জীপ ভাড়া এভারেজে অনেক কম পড়বে। নয়তো ২-৩ জন এভারেজ খরচ বাড়বে
* ডাউকি বাজারে ট্রাভেল ট্যাক্স দিয়ে যাওয়ার কোন অপশন নাই। ঢাকা থেকে ট্যাক্স দিয়ে গেলে ভালো। নয়তো ওখানে ৬০০ টাকা দিতে হবে। পরে ওরা চালানের মাধ্যমে ট্যাক্স দিয়ে দিবে।
* ইমিগ্রেশনে অযথা ১০০ টাকা দাবী করবে। না শোনার ভান করে চলে আসবেন। 
* ডাউকি ইমিগ্রেশনে রুপি আর টাকা থাকলে সামান্য ঝামেলা করে। সাথে ডলার থাকলে কোন সমস্যা নাই। যাদের কার্ড আছে লাস্ট ডিপোজিট স্লিপটা সাথে রাখুন। নয়তো মাঝেমধ্যে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হবে যে কার্ডে টাকা আছে। 
* ডাউকি ইমিগ্রেশনের সামনে থেকে গাড়ী নিলে ভাড়া বেশি পড়বে। একটু হেটে সামনের বাজারে চলে গেলে অনেক গাড়ী পাবেন আর দামাদামির সুযোগ পাবেন।
* টাকা পয়সা যা থাকবে সব একেবারেই বাজার থেকে ভাঙ্গিয়ে নিতে হবে। যদি শিলং যাওয়ার প্ল্যাণ থাকে তাহলেও এখান থেকে ভাঙ্গায়া নিন। শিলং এ টাকার রেট এখান থেকেও কম পাবেন।

শেষে বলবো- সোনেংপেডাং সহ মেঘালয়ের অন্যান্য অংশ খুবই সুন্দর আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দয়া করে কোন ধরনের প্লাস্টিক আবর্জনা সেখানে ফেলবেন না। আশে পাশে প্রচুর ডাস্টবিন রয়েছে। ময়লা সেখানে ফেলুন। পরিবেশ ভালো রাখুন।

লেখকঃ 

Nahidul Alam Neel