নংরিয়াত এবং একটি রেইনবো ফল (চেরাপুঞ্জি, মেঘালয়) অনেক জল্পনা কল্পনা শেষে দুই বন্ধু মিলেই…

নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় ছোট্ট একটি দ্বীপের নাম নিঝুম দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের কোলে উত্তর ও…
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় ছোট্ট একটি দ্বীপের নাম নিঝুম দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের কোলে উত্তর ও…
December 21, 2018
কক্সবাজার নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই, বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কক্সবাজার যায়নি এমন লিজেন্ড…
কক্সবাজার নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই, বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কক্সবাজার যায়নি এমন লিজেন্ড…
December 21, 2018
নংরিয়াত এবং একটি রেইনবো ফল (চেরাপুঞ্জি, মেঘালয়) অনেক জল্পনা কল্পনা শেষে দুই বন্ধু মিলেই…

নংরিয়াত এবং একটি রেইনবো ফল
(চেরাপুঞ্জি, মেঘালয়)

অনেক জল্পনা কল্পনা শেষে দুই বন্ধু মিলেই মেঘালয় যাই গত ১২-১২-১৮ তারিখে। গিয়ে শ্নংপেডেং, ডাউকি, চেরাপুঞ্জি, নংরিয়াত, শিলং ঘুরে আবার ঢাকা চলে আসি ১৬-১২-১৮ সকালে।
মেঘালয় নিয়ে অনেক পোস্ট আছে, সেগুলো অনেক ইনফরমেটিভ। আমি শুধুমাত্র নংরিয়াত ভিলেজ এর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখবো। এখানে আছে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ, সিংগেল রুট ব্রিজ, ন্যাচারাল সুইমিং পুল এবং রেইনবো ফলস।

শ্নংপেডেং থেকে ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে আমরা চলে যাই চেরাপুঞ্জি। যাওয়ার পথে পরে মকডক ভিউ পয়েন্ট এবং ডুয়ান সিং ভিউ পয়েন্ট। এরপর চেরাপুঞ্জি গিয়ে পাই সেভেন সিস্টার ফলস এবং মাওসমাই কেভ। এরপর চেরাপুঞ্জি তে আর কিছু দেখি নাই কারণ প্ল্যান হচ্ছে বিকাল তিনটার মধ্যে “তেরনা ভিলেজ” পৌছানো। নাহলে ৫ টার মধ্যে নংরিয়াত যেতে পারবো না এবং নংরিয়াতে ৫ টার পরেই অন্ধকার নেমে যায়।
আমরা ৩ টার মধ্যেই তেরনা পৌছাই। সেখান থেকে একের পর এক গাইড আসবে, হোমস্টে ঠিক করেছেন কি না জিজ্ঞেস করবে যেনো আপনি তাদের একজন কে হায়ার করেন এজন্য। কিছুই লাগবে না। ওখানেই সিড়ি আছে যেখানে নংরিয়াত যাওয়ার রাস্তার শুরু।

নংরিয়াত হচ্ছে পাহাড়ের খাদে এমন একটি গ্রাম যেখানে পায়ে হাটা ছাড়া অন্য কোন ভাবে যাওয়া সম্ভব না। তেরনা থেকে ৩৮০০+ সিড়ি বেয়ে নেমে (মাঝে মাঝে উঠতেও হয় সিড়ি বেয়ে) যেতে হয় নংরিয়াতে।

দুইজন দুইটা বাশের লাঠি কিনে নিয়ে শুরু করি সিড়ি বেয়ে নামা। একটা ইনফো আমাদের জানা ছিলো না যে ব্যাগ তেরনা ভিলেজে রেখে আসা যায়। আবার ব্যাক করার সময় ব্যাগ নিয়ে নিলেই হয়। আমরা এটা জানতাম না এবং এর জন্য অনেক প্যারা খাইতে হইছে। সেটায় পরে আসতেছি।

একদম সিমেন্টেড সিড়ি, মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় রেলিং আছে, কিছু যায়গায় নাই। প্রথমেই চোখে পড়বে তেরনা ভিলেজ, পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ছোট্ট গোছানো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গ্রাম। আমাদের জানামতে নামতে প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগে। নামা শুরু করি। ২৫০-৩০০ সিড়ি নামার পরেই বুঝতে পারি যে ব্যাগ কত বড় একটা বার্ডেন! নামতেই ব্যাগের জন্য কষ্ট বেশি হচ্ছে, উঠার সময় কি করবো!! মাঝে মাঝে দুই একজন কে দেখা যাচ্ছিলো যারা নংরিয়াত থেকে এই ৩৮০০+ সিড়ি বেয়ে উঠে আসছিলো, তাদের চেহাড়া এবং অবস্থা থেকে মোটামুটি ভালো ধারনা পাওয়া যাচ্ছিলো কতটা কষ্ট হবে উপরে উঠে ব্যাক করতে। আর রাস্তা ভুল করার চান্স নেই, এই সিড়ি দিয়েই নামতে হয়। এক জায়গায় কনফিউশন লাগে, সেখানে একদিকে সিংগেল ডেকার রুট ব্রিজ আছে, যেতে ২০-৩০ মিনিট সময় লাগে। আশেপাশে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দিবে কোন দিকে যাইতে হবে। আমরা সেদিকে যাই নি।

যাইহোক, বেশ কিছুদুর নামার পর দেখা পেলাম এই রুট এর প্রথম সাসপেনশন ব্রিজ এর। সেটা বন্ধ ছিলো, জানিনা কেনো! এটার নিচ দিয়ে পাথর-পানি ডিংগিয়ে পার হয়ে যেতে হয়েছে। এরপর কিছুদূর গিয়ে ২য় সাস্পেনশান ব্রিজ। উঠার সাথেই কাপাকাপি শুরু। এটা পার হওয়ার পর কিছুদুর উঠতে হয়। আবার তারপর নামা শুরু। এভাবে ১০% চড়াই এবং ৯০% উতরাই করে আমরা ১ ঘন্টার মত সময়ে নংরিয়াত পৌছাই।

ততক্ষনে প্রায় সন্ধ্যা, ৪.৩০ বাজে। গিয়েই প্রথম কাজ হোমস্টে, যেহেতু আগে বুকিং দেয়া নাই। আমরা পূর্ব রেফারেন্স অনুযায়ী প্রথমেই গিয়ে পেয়ে যাই “শিরিন হোমস্টে (Serene homestay)”। সেখানে পারহেড ৩০০ রুপি তে ডর্ম এ থাকা যায়। ডর্ম মানে এক রুমে ৫ জন। রাতের খাওয়াও সেখানেই, তার জন্য আলাদা পে করতে হয়। কখন ডিনার সার্ভ করবে বলে দিবে। আমাদের বলছে ৭.৩০ এ।

তো আমরা চলে যাই পাশেই ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ এ। শিরিন থেকে ১ মিনিটের পথ। সেখানে গিয়ে দেখা মেলে রুট ব্রিজ এবং সাথেই ছোট ঝর্না এর মত এবং সামনে পুল এর মত। লোকজন সেখানে পা চুবিয়ে বসে আছে। এই পুল টা ন্যাচারাল স্পা বলা যায়। কিছুক্ষন পা চুবিয়ে বসে থাকলে ছোট ছোট মাছ এসে পায়ে কামড় দেয়া শুরু করবে এবং পায়ের ময়লা খাওয়া শুরু করে দিবে। অদ্ভুত রকম লাগছিলো বলে বেশিক্ষন রাখতে পারছিলাম না। ৫ মিনিট পা চুবিয়ে রেখেই পুরা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছিলো, এতদূর সিড়ি বেয়ে নামার কষ্টও কমে যাচ্ছিলো।

তো আরেক ইন্ডিয়ান এর সাথে কথা হয়। সে সেদিন রেইনবো ফল ঘুরে এসে রাতে নংরিয়াত এ থাকতেছে। তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে ন্যাচারাল সুইমিং পুল যেতে প্রায় ৩০ মিনিট লাগবে এবং রেইনবো ফল যেতে আরো ৩০ মিনিট। তবে রেইনবো ফল যাওয়ার পথটা কঠিন, কারন শুধু উপরের দিকে হ্যান্ডমেড পাথুরে সিড়ি বেয়ে উঠতে হবে, সিমেন্টেড সিড়ি নাই। এবং অনেক খাড়া সিড়ি!

রাতে শিরিনেই খাওয়াদাওয়া, পুরোপুরি “ভেজ”, তারা “নন-ভেজ” রাধে না। খাওয়ার পর চা খেয়ে আমরা বসে যাই বাকি ট্যুরিস্ট দের সাথে আড্ডায়। একদম চুপচাপ, নীরব একটা গ্রাম! শুধু পাশ দিয়ে পাথড় থেকে পাথড়ে পড়া পানির শব্দ! ১১ টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে রাতে ঘুম। এখানে ঠান্ডা তুলনামূলক কম ছিলো, কারণ অনেক নিচে এবং পাহাড়ের একদম খাদে এই গ্রাম।

পরদিন সকাল সকাল উঠে পরি ন্যাচারাল সুইমিং পুল যাবো বলে। আমাদের আবার সেদিনই ব্যাক করে শিলং যেতে হবে। শুরু করি সকাল ৭.০০ টায়। পথে পরে সিংগেল ডেকার রুট ব্রিজ, কিন্তু সেটাও বন্ধ ছিলো। সেটার নিচ দিয়েই পাথর ডিঙিয়ে পার হই। এরপর বেশ কিছু চড়াই উতরাই এবং একটা সাসপেনশান ব্রিজ পার করে প্রায় ৩০-৩৫ মিনিট পর দেখা মেলে ন্যাচারাল সুইমিং পুলের! চোখ জুড়িয়ে যাওয়া দৃশ্য! একদম নীল এবং স্বচ্ছ পানি! তলা দেখা যায় সব যায়গায়! সেখানে বসে বসে চিন্তা করি যে এতদূর এসে রেইনবো ফলস না দেখে গেলে বৃথা হয়ে যাবে!

আবার শুরু করি পাহাড় চড়া! এবার আর সিমেন্টেড সিড়ি নয়, পাথর এবং মাটির সিড়ি, এবং কোন উতরাই নাই, শুধুই উপরের দিকে খাড়া সিড়ি বেয়ে উঠা! এক পাশে পাহাড়, এক পাশে খাদ! পায়ের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গেছিলো যে আমরা ৩ বার ডিসিশন চেঞ্জ করছি যে নাহ, আমাদের দিয়ে হয়তো হবে না! ফিরে যাই। একটু পরপর ম্যাপ দেখি, কিন্তু ডিস্ট্যান্স কমে না, কারণ উঠতেছি উপরের দিকে, সামনে আগাচ্ছি খুব কম! সব মিলিয়ে আরো ৪০ মিনিট উঠতে হয়। এই ৪০ মিনিট আমাদের কাছে ৪ ঘন্টা মনে হইছে। মাটি পাথর এর সরু সিড়ি বেয়ে উঠার পর দেখা মেলে কাংখিত রেইনবো ফল এর! দূর থেকে দেখা যাচ্ছে তার নীল পানির পুল এবং সুউচ্চ ঝর্ণা!

কিন্তু ফল পর্যন্ত যেতে আবার খাড়া নেমে যেতে হয়! নেমে দেখি ফল এর নিচ পর্যন্ত যাওয়ার কোন রাস্তা নাই! একটা দোকান এর মত আছে এখানে, কিন্তু অনেক সকালে এবং সবার আগেই যাওয়ায় সেটাও বন্ধ। এপাশ ওপাশ খুঁজে বুঝতে পারি যে নামার রাস্তা একটাই, পাহাড়ের গা ঘেঁষে চার হাত পা ইউজ করে খাজে খাজে পা দিয়ে নামা! নেমে যা দেখি তা অবর্ণনীয়!! সবচেয়ে নীল পানি, সবচেয়ে পরিষ্কার এবং এই শীতেও সবচেয়ে বেশি পানি এই রেইনবো ফলেই আছে! নীল পানি ক্রাংসুরি তেও দেখছি, কিন্তু এটার টা অবিশ্বাস্য! অসম্ভব সুন্দর।

এক ঘন্টার মত ছিলাম সেখানে। ফলের ঠিক সামনেই একটা বিশাল পাথর আছে, সেটায় উঠে বসে থাকা যায়। আমরা শুধু বসে বসে নীল পানি আর ঝর্নার শব্দ উপভোগ করি।

এরপর পানিতে নামার পালা। এখানে কোন লাইফ জ্যাকেট নাই, যারা সাতার পারেন না বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নাই, বেশ কিছুদূর পর্যন্ত নামতে পারবেন। হিম শীতল পানি তে কিছুক্ষন সাতার কেটে, শরীরের ক্লান্তি দূর করে এবার ফেরার পালা! তখনি দেখা মেলে রেইনবোর। সূর্যের আলো ফলে এসে পরে এবং স্পষ্ট রেইনবো দেখা যায়। সূর্য উপরে উঠতে থাকে, রেইনবো নিচে নামতে থাকে!

ততক্ষনে আরো কয়েকজন চলে আসে, তারাও নেমে যায়। আমরা ওই পাহাড়ের খাজে খাজে পা দিয়ে উঠে আসি, দোকান টাও খোলা পাই। সেখান থেকে এগ ম্যাগি খেয়ে নেই, সাথে পানির বোতল কিনে নেই। ৫ মিনিট খাড়া উঠার পর বাকিটা শুধুই নামা এবার। ফেরার রাস্তা সহজ, কারণ এবার শুধুই নেমে চলা। ৫০ মিনিটের মধ্যে আমরা চলে আসি নংরিয়াত ভিলেজে। তখন প্রায় ১২ টা বাজে।

এখানের রাস্তা ইজি, হারানোর ভয় নাই, সিড়ি ধরে চললেই হয়, গাইড থাকলে এক্সট্রা কোন সুবিধা নাই, শুধু মানসিক শান্তি পাবেন যে হারাবেন না! নংরিয়াত ফিরে এসে আমরা একজন কে ঠিক করি আমাদের ব্যাগ তেরনা ভিলেজ পর্যন্ত দিয়ে আসার জন্য। কারন রেইনবো ফলস থেকে আসার পর এই ভাড়ি ব্যাগ নিয়ে ৩৮০০ সিড়ি বেয়ে উঠা সম্ভব না! অলরেডি পায়ের এন্ডিউরেন্স লিমিট শেষ! এরপর একটু একটু করে সিড়ি বেয়ে উঠা আর ২-১ মিনিট বিরতি দিয়ে আবার চলা শুরু, এভাবে ১ ঘন্টায় আমরা তেরনা ভিলেজে চলে আসি।

ততক্ষনে আমাদের পা মোটামুটি সব অনুভূতি হারায় ফেলছে, শীতের মধ্যেও ঘেমে একাকার, নাক-মুখ মিলেয়েও শ্বাস নিয়ে হচ্ছে না! তেরনা ভিলেজ এসে আমরা আর তিনজন ইন্ডিয়ান এর সাথে শেয়ারড ট্যাক্সি করে চলে আসি চেরাপুঞ্জি তে, সেখান থেকে শিলং।

র‍্যুটঃ
চেরাপুঞ্জি-তেরনা ভিলেজ-নংরিয়াত-ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ-ন্যাচারাল সুইমিং পুল-রেইনবো ফলস

সময়ঃ
তেরনা ভিলেজ থেকে নংরিয়াত > ১ থেকে দেড় ঘন্টা (৩৮০০+ সিড়ি)
নংরিয়াত থেকে ন্যাচারাল সুইমিং পুল > ৩৫-৪০ মিনিট
ন্যাচারাল সুইমিং পুল থেকে রেইনবো ফল > ৪০-৫০ মিনিট

সাজেশন হচ্ছে একদিনেই নংরিয়াত গিয়ে রেইনবো ফলস ঘুরে আবার তেরনা বা চেরাপুঞ্জি ব্যাক না করাই ভালো। শরীর নিতে পারবে না এত ধকল যদি আপনার আগে থেকেই এত ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা না থাকে। একরাত নংরিয়াত এ থেকে পরের দিন ব্যাক করা উচিৎ।

“নোটঃ মেঘালয়ের খুবই সুন্দর আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দয়া করে কোন ধরনের প্লাস্টিক আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। আশে পাশে প্রচুর ডাস্টবিন আছে। ময়লা সেখানে ফেলুন। পরিবেশ ভালো রাখুন।”