“উত্তরের পথে ঘাটে প্রান্তরে” প্রথম পর্বঃ রৌমারির ভোর
"শিলং, মেঘালয় ট্রিপ"
“শিলং, মেঘালয় ট্রিপ”
November 22, 2018
সেন্ট মারটিন ভ্রমন কাহিনী :) এটা আমার প্রথম কোন সমুদ্র সৈকত ও দ্বীপ ভ্রমন…
সেন্ট মারটিন ভ্রমন কাহিনী :) এটা আমার প্রথম কোন সমুদ্র সৈকত ও দ্বীপ ভ্রমন…
November 29, 2018

প্রতি বছর শীতের আগমনী ঘটে আমার উত্তরের পথেঘাটে হেঁটে হেঁটে। এ বছরও ব্যতিক্রম হবে কেন। সেই ২০১৭ সালের নভেম্বরে এই প্রসিদ্ধ জনপথে আমার পায়ের ধুলি পড়েছিল৷ এরপর বিস্তর ১ বছরের অপেক্ষার অবসান হল সেই পুরান পথের সাথীদের নিয়েই। এই এক বছরে বড় পরিবর্তন ডাবল ডিমের ওয়াফি ডায়েট আর ব্যায়ামের ফাঁকতলে পড়ে হ্যান্ডসাম পুরুষে পরিণত হয়েছে। আর আমার ভুঁড়িখানা যেন গত বছরের থেকে আরও পড়তির দিকে। কি হবে এই ভুঁড়ি নিয়ে চিন্তার প্যাচে পরে যখন মনটা হাসফাস করছিল তখনই ওয়াফি আহমেদের ফোন পেলাম। আশিক ভাই অনেক দিন আমার সাথে ট্যুরে যান না। এই ১৫ই নভেম্বর চলেন উত্তরবংগে যাই। ঈসমাইল ভাই কেও বলেন। এবার আমাদের সাথে হাদি ভাই যেতে পারে। একটা প্ল্যান করেন। সর্বদা অস্থির ওয়াফি শব্দ বোমা ফেলে লাইনটা কেটে দিল। আমি ভাবছি কি হল। হালের ক্রেজ তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজংঘা দেখার লোভে পাপী হয় প্ল্যানটা সেভাবেই সাজালাম। তবে একটু ভিন্ন মাত্রা আনলাম রৌমারি থেকে যাত্রার শুরু করে। যথারীতি রিফাত পরিবহনের টিকেট কাটা শেষ। এখন অপেক্ষা ১৪ তারিখের। মাঝে নানা ঋষিমুনি যাবার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত টিকলো সেই পুরান তিনের সাথে নতুন হাদি ভাই।

বাসে উঠার আগে হিনো ইঞ্জিনের গাড়ী দেখে মনে মনে ছ্যা করে উঠলেও, তার টান দেখে পড়ে আমার শ্রদ্ধায় মাথাটা নুয়ে এসেছিল। কি টান রে বাবা। আধো ঘুম জাগরণের মাঝে আমাদের রাত চারটার দিকে রৌমারি নামিয়ে দিল রিফাত পরিবহন। চারদিকে ঘুটঘুটে আঁধার। কেটে যাবে আমানিশার এই ঘনঘোর যখন হবে ভোর। বাস স্ট্যান্ডের পাশেই চায়ের দোকান৷ গ্রামের চায়ের দোকান সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীড় জমে থাকে৷ শীতের এই রাতে কি শেষ বাসের জন্যই দোকানের ঝাপা খুলে বসে ছিল দোকানদার৷ উত্তরবংগে শীতে বাঘে কুমিরে এক সাথে জল খায়৷ শীতের উষ্ণতা কিছুটা টের পেতে লাগলাম। ওয়াফি খাদক হিসাবে বেশ নামকরা৷ সে এবার ডায়েটে আছে এরপর দেখলাম এই মধ্যরাতে রুটি বিস্কুট মেরে দিল৷ দোকানদার যেন আমাদের জন্যই বসে ছিল৷ কড়া লিকারের চা না হলেই নয়৷ দোকানদারের কাছ থেকে রৌমারি ঘুরার একটা মোটামুটি আইডিয়া নিলাম।ভোর না হওয়া পর্যন্ত সময় তো কাটাতে হবে৷ হাদি ভাই তার পাহাড়ের গল্পের পসরা নিয়ে আসর মাতিয়ে রাখলো। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা পাহাড়ীপ্রেমীদের জীবনে। সময় যে কি ভাবে কেটে গেল টের পেলাম না। ঠিক ভোর ছয়টার দিকে আকাশ যখন পরিষ্কার হচ্ছে তখন দেখতে পারলাম বাস স্ট্যান্ডে আস্তে আস্তে ভ্যান, অটো ভীড় করছে। সাত সকালে ৪০০ টাকা দিয়ে ভ্যান ঠিক করলাম। প্রথম গন্তব্য বড়াইমারি স্মৃতি সৌধ। যেখানে বিজিবি-বিসিএফ লড়াইয়ের স্মৃতি সংরক্ষন করা হয়েছে।

ভ্যান চলা শুরু করলো। রৌমারি আকাশে তখন কুয়াশার ধোঁয়া৷ বিন্দু বিন্দু শিশির জমেছে কচি ঘাসের ডগায়৷ হাঁড়কাপুনি শীতে কর্মজীবি ছাড়া সবাই লেপের তলে৷ তাই ঢাকা থেকে আগত বিশেষ চিড়িয়ারা মানুষের প্রধান আর্কষণ হয়ে গেল। আড়চোখের আড়ালে যে নিখাঁদ কৌতুহলের প্রেম লুকিয়ে আছে তা জানতে হলে সাহিত্যিক হওয়া লাগে না। কুয়াশার মাঝে উকি দেয়া গুচ্ছ গুচ্ছ ভোরের আলো স্বাগত জানাচ্ছে নতুন দিনের। দেখতে দেখতে চলে এলাম জিঞ্জিরাম নদীর কাছে। সূর্যটা ততক্ষনে আকাশে সোনালী হাসি নিয়ে উদয় হয়েছে। নদীর পার এসে মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে গেল। নদী যেন আমার সাথে দুক্ষের অদ্ভূত কিছু কথোপকথন নিয়ে বসে আছে৷ জিঞ্জিরাম কত সুন্দর তার নাম। টলটলে নদীর পানি। সবুজের ছায়াঘেরা আশেপাশের পরিবেশ। এইটি একটি পাহাড়ী নদী। মেঘালয়ের পশ্চিম গারো পাহাড়ের সীমানা পেরিয়ে সিংগিমারি ঝর্নার আপার স্ট্রীম থেকে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলায় দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে জিঞ্জিরাম নদী।। আশেপাশে দশগ্রামের দুক্ষ এই জিঞ্জিরাম নদী। পাকা সেতু না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় আশেপাশের ১০ গ্রামের মানুষদের। আবার বর্ষার পাহাড়ী ঢলেও ডুবে যায় দশ গ্রামের ফসল। নদীর বুকে বাঁশের সাকো। সেই সাকোর পাশেই একটা পাকা সেতুর হিল্লে করার কাজ দেখা যাচ্ছে। বাঁশের সাকো দিয়ে সাত সকালে পার হচ্ছে মানুষ, মোটর সাইকেল থেকে শুরু করে অটো, ভ্যান। আমাদের ভ্যানয়ালা জহুরুল ভাই এতক্ষনে আমাদের দিকে চেয়ে মৃদ্যু হাসলো মামা আপনাদের নামতে হবে, আপনার হেঁটে সাকো পার হন আমি ভ্যান নিয়ে ওপারে যাই। এই হাসির আড়ালে যেন বলছে একজন ভাল্লুক ওয়াফি আর পান্ডা আশিকই যথেষ্ট ভ্যান ডুবাতে আর সাকো ভাংগতে। হেঁটে হেঁটে পার হচ্ছি আর প্রকৃতি থেকে শুদ্ধ বাতাস ফুসফুসে ট্র‍্যান্সফার করছি। ঢাকায় এই শুদ্ধ বাতাস কোথায় পাব।

ব্রীজ পার হবার পর বুড়া চাচা কে জিজ্ঞেস করলাম বড়াই বাড়ী স্মৃতিসৌধ আর কত দূর। চাচা বললো এই তো কাছে। গ্রামের মানুষের কাছে মানেই ৩-৪ কি.মি। সকালে ন্যাচরাল ভিউ দেখে আর রাতের ঘুমের অভাবে আমাদের ঈসমাইল ভাই ইতিমধ্যে চলে গেলে ভিন্ন জগতে। ব্রেইনের সাথে কানেকসন না হবার দরুণ সে বার বার স্থানীয় মানুষদের জিজ্ঞেস করছে বড়াইবাড়ী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ কই৷ স্থানীয় মানুষ মাথা চুলকিয়ে ভাবে এই বড়াইবাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আসলো কোথায় থেকে। হাদি ভাই ঈসমাইল ভাইয়ের মাথায় মৃদ্যু চাটি দিয়ে বললো ঈসমাইল তুই অফ যা। ঈসমাইলের ভাই অফ হবার ফাঁকে আমরা ঘুরে আসি বড়াইবাড়ী যুদ্ধের ইতিহাস থেকে।

১৮ই এপ্রিল ঐতিহাসিক বড়াই বাড়ী দিবস। ২০০১ সালে সেই দিনে আমাদের নও জোয়ান প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বড়াইবাড়ী সীমান্তে। বড়াইবাড়ী বিজিবি ক্যাম্প দখল করার উদ্দ্যেশে সীমান্ত অতিক্রম করে সে দিন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বিনা উস্কানিতে ১০৬৭/৩ সীমান্ত পিলার অতিক্রম করে ঢুকে গিয়েছিল বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ডে। রাতের আঁধারে বড়াইবাড়ী বিডিআর ক্যাম্প দখলে নেয়ার চেষ্টা চালায় তারা। বড়াইবাড়ী গ্রামে বিরাজ করে আতংক। বড়াইবাড়ী গ্রামে প্রবেশ করে পথভ্রষ্ট বিসিএফ সদস্যরা তাণ্ডবলীলা চালায়৷ ভারতীয় বিশাল বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে আটল থাকে ক্যাম্পে থাকা ২৫ বিজিবি সদস্য। পরে লে. কর্নেল শায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত ফোর্স বড়াইবাড়ী সীমান্তে আসলে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়।যুদ্ধে জয়ী জাতি সেদিন আবার দেখেছিল গণমানুষ আর বিজিবি’র সম্মলিত প্রতিরোধ। ১৮-২০ এপ্রিল তিনদিন ব্যাপী যুদ্ধে ১৮ জন বিএসএফ সদস্য মারা যায়। আমাদের পক্ষ থেকে তিনজন বিজিবি সদস্য শাহাদাত বরন করেন। বিএসএফ এর সদস্যরা এই তিন দিনে গ্রামের ৮৬ বাড়িতে আগ্নি সংযোগ করে। সরকারি হিসাবে সে দিন ১৮ জন বিএসএফ সদস্য মারা গিয়েছিল, তবে গুঞ্জন আছে এত থেকে বেশি সংখ্যক বিএসএফ সদস্য মারা যায় সেদিন। বেঁচে থাকা বাকি সদস্যরা আত্মসর্মপণ করে৷ পরবর্তীতে এই যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষনের জন্য বড়াইবাড়ী বিজিবি ক্যাম্পের পাশে গড়ে তোলা হয় একটি স্মৃতিসৌধ।

ইতিহাসের ভুবনে বিচরন শেষে পৌছে গেলাম আমাদের কাংখিত বড়াইবাড়ী বিজিবি ক্যাম্পের সামনে। ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা সচরাচর ঢাকার মানুষ দেখে না। আমাদের দেখে বেশ অমায়িক আচরণ করলো। ক্যাম্পের ছবি আর স্মৃতিসৌধের ছবি তুলতে না করলো কিন্তু আশেপাশের ঘুরার অনুমতি দিল৷ স্মৃতিসৌধটা সংরক্ষনের অভাবে বেশ জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। যুদ্ধের রোড ম্যাপ, আর কি কি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল যুদ্ধে সেইটা সুন্দর ভাবে দেওয়া আছে। একজন বিজিবি সদস্য আমাদের পুরা জিনিষটা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলে। ম্যাপের লাল লাইনের দাগ দিয়ে বিএসএফ। নীল দিয়ে বিজিবি কে বুঝানো হয়েছে৷ ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আমরা ফিরে এলাম ভ্যানে। এবারের গন্তব্য চর নতুন বন্দর, এল.সি পোর্ট৷ ভ্যান আবার ফিরে এল গ্রামের মেঠো পথ ধরে নতুন গন্তব্যে।

নতুন বন্দর এল.সি পোর্ট যখন এসে পৌছলাম তখন ঘড়ির কাটায় ৮টা বাজে৷ শুল্ক স্টেশনে এখনও কর্মকর্তারা এসে পৌছায় নাই৷ ২০১৪ সালে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রৌমারী ভোলা মোড় থেকে নুতন বন্দর জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ২৪ ফিট প্রস্থের প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক তিনটি ব্রিজসহ নির্মাণ করা হয়। এরপর এখান থেকে দুই দেশের মধ্যে আমদানি রফতানি হচ্ছে দেদারসে৷ এল.সি’র মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ভার‍ত থেকে পাথর ও কয়লা আমদানি করা হচ্ছে৷ প্রতিদিন হাজার হাজার টন পাথর এই নতুন বন্দরে আনলোড করা হয়। তাই এল.সি পোর্টের পাশেই গড়ে উঠেছে পাথর ভাংগার স্পট। সকাল বেলা সকালেই তাই দেখা যাচ্ছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। ক্রাসার মেশিন বসিয়ে হাজার হাজার টন পাথর ভেঙে বিভিন্ন সাইজের তৈরি করা হচ্ছে। এরপর পাঠানো হচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। শ্রমিক মালিকদের ভীড়ে মুখরিত চর নতুন বন্দর। রৌমারি একটা মাইল ফলক দেখে থামলাম আমরা চার অভিযাত্রী। এখান থেকে কিছু ছবি তুলে রওনা হলাম আবার রৌমারির পথে ঘাটে।

(চলবে…..)

ফটো ক্রেডিটঃ আমি এবং Ismail Hossain ভাই।

“ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলি। শহরের ময়লা শহরে এসে ময়লার জন্য নিদিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলিন ভ্রমণ স্থান রাখি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।”

লেখকঃ 

Ashik Sarwar